ভারতে পানির জন্য বহু বিয়ে

ভারতের মহারাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের একটি সাধারণ গ্রাম দেনগানমাল। ৫০০ অধিবাসীর ছোট এই গ্রামের সবাই একে অপরের পরিচিত। এখানেই দেখা হয় শাখারাম ভগতের সঙ্গে।

শাখারাম ভগতের কুঁড়েঘরটি কাদামাটির তৈরি, যার ভিত্তি হিসেবে আছে কয়েকটি কাঠের বর্গা। তবে এটিই এলাকার সবচেয়ে বড় ঘর। আর এলাকার অন্যতম বড় পরিবারও শাখারামের।

ভগতের বাড়িতে সিএনএনের সাংবাদিকরা পৌঁছাতেই তাঁদের স্বাগত জানাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন রঙিন শাড়ি পরা মধ্যবয়সী এক নারী। নিজেকে তিনি টুকি বলে পরিচয় দেন। আরো দুই নারী ঘরের ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে দেখছিলেন কে এসেছে। ক্যামেরা দেখে আর অনেক প্রশ্ন শুনে তাঁদের আগ্রহ হওয়াটাই স্বাভাবিক।

টুকি যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, আশপাশেই ঘুরছিলেন অপর দুই নারী শাকরি ও ভাগ্গি। টুকি হলেন শাখারামের প্রথম স্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক দিন ধরে তাঁর বিয়ে হয়েছে। নিজেই ভুলে গেছেন কতদিন হয়েছে। পরে শাখারামের পরিবারে যোগ দেন শাকরি আর ভাগ্গি। তাঁরা ভগতের দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্ত্রী।

অবৈধ বিয়ে

বহুবিবাহ জটিল ও অস্বাভাবিক সম্পর্ক। একই সঙ্গে এটি ভারতের আইনের পরিপন্থী। মুসলমান ছাড়া অন্য সবার ক্ষেত্রে ভারতে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ। তবে ভগতের পরিবার হিন্দু। বিষয়গুলো বলা হলে নিজেদের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন টুকি।

টুকি বলেন, তাঁর ও শাখারাম ভগতের ছয় ছেলেমেয়ে। ওরা ছোট থাকা অবস্থায় টুকি দেখাশোনা করতেন আর ফসলের মাঠে কাজ করতেন শাখারাম। ঘরের কাজকর্ম, পরিষ্কার, রান্না ছেলেমেয়ের গোসল ও খাওয়ানোর কাজ করতে গিয়ে টুকিকে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়। সেখানে কোনো পানি ছিল না।

দেনগানমাল গ্রামটি এমন অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে যা নিয়মিত খরায় পড়ে। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে কুয়াগুলো শুকিয়ে যায় এবং গবাদি পশু মারা যায়। গ্রামের পানি সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা নেই। এটি দূরবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত গ্রামটি অন্য গ্রাম থেকেও বিচ্ছিন্ন।

পানি সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো পানি আছে এমন কোনো কুয়া বা নদী থেকে পানি পাত্রে ভরে নিয়ে আসা। তবে এর কোনোটিই গ্রামের কাছাকাছি নয়। পানি আনতে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। টুকি বলেন, এতটা দীর্ঘ সময় ছেলেমেয়েদের একাকী রাখেন কী করে?

শাখারাম অনন্যোপায় হয়ে আবার বিয়ে করেন। পরে আরো একটি বিয়ে করেন। তাঁর দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্ত্রী পানি নিয়ে আসে। টুকি ঘরদোর সামলায় আর বাচ্চাদের দেখাশোনা করে।

শাখারাম বলেন, ‘আমি যা করেছি শুধুমাত্র পানির জন্যই করেছি।’

পানি স্ত্রী

শাকরি ও ভাগ্গি স্থানীভাবে ‘পানি বাই’ বা পানি স্ত্রী নামে পরিচিত। বছরের পর বছর তাঁরা একই সূচি মেনে চলেন। গ্রীষ্মের মাসগুলোতে শাকরি ও ভাগ্গি সূর্য উঠতেই ঘর ছাড়েন, আর মাথায় থাকে খালি পাত্র। পাহাড়ি অঞ্চলের মাঠ ও মেঠোপথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা পানি আনেন।

শাকরি ও ভাগ্গিদের যাত্রা বেশ কঠিন। প্রতিটি পাত্রে ১৫ লিটার করে পানি ধরে। প্রত্যেক নারীকে এমন দুটি পাত্র মাথায় বহন করতে হয়। বর্ষায় তাঁদের যাত্রাপথ সংক্ষিপ্ত কারণ গ্রামের কাছের অনেক কুয়ায় পানি দেখা যায়।

টুকি বলেন, শাকরি ও ভাগ্গি দুজনই বিধবা ছিলেন। পুনরায় বিয়ের মাধ্যমে তাঁরা আবার সামাজিক মর্যাদা পেয়েছেন। ভারতের অনেক প্রত্যন্ত গ্রামে প্রথা শিকড় বেশ নিবিড়। বিধবা হওয়ার পর নারীরা একঘরে হয়ে পড়েন। ধর্মীয় কোনো আচার অথবা সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁরা অংশ নিতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা পরিবারে অন্য সব সদস্যদের সঙ্গে একসাথে বসে খেতে পারেন না।

শাকরি ও ভাগ্গির জীবনে গল্প আর পুনরায় বিয়ের পর তাঁদের মর্যাদার পরিবর্তন সম্পর্কে জানা যায়নি। তবে শাখারামের পরিবারের সঙ্গে বসে তাঁদের খেতে দেখা গেছে। শোনা গেছে তাঁদের হাসির শব্দও।

টুকি জানান, তাঁদের পরিবারে শাখারি ও ভাগ্গি এভাবেই আছেন অনেক বছর ধরে। ওই সময়ের মধ্যে দেনগানমাল গ্রামের তেমন কোনো বড় পরিবর্তন হয়নি। এখনো গ্রামে পানির কোনো উৎস নেই। তাই পরিবারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্ত্রী প্রতিদিন পানি আনতে যান। রান্না, পরিষ্কার, থালাবাটি ও কাপড় ধোয়া, গোসল অনেক কাজেই পানি লাগে।

এটি পানি অথবা এর স্বল্পতা যা শাখারামের অন্যরকম পরিবারকে একত্রে রেখেছে।


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *